আলীমুল ইসলাম | বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬ | প্রিন্ট
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা যেন বাংলাদেশের মানুষের জীবনের এক স্থায়ী উদ্বেগে পরিণত হয়েছে। চাল, ডাল, তেল, আটা, চিনি, শাকসবজি, মাছ-মাংসসহ প্রতিদিনের খাদ্যতালিকার প্রায় প্রতিটি পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। আয় বাড়ার তুলনায় ব্যয় বৃদ্ধির গতি বেশি হওয়ায় বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। বাজারে পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও দাম না কমা কিংবা সামান্য সরবরাহ সংকটেই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ঘটনা ভোক্তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি করছে। প্রশ্ন হচ্ছে, নিত্যপণ্যের বাজারে এই অস্থিরতা থেকে উত্তরণের কার্যকর উপায় কী?
বাজারে মূল্যবৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, পরিবহন ও জ্বালানি খরচ, আমদানিনির্ভর পণ্যের ক্ষেত্রে ডলারের বিনিময় হার, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা পণ্যমূল্যে প্রভাব ফেলে। তবে এসব বাস্তব কারণের পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, মধ্যস্বত্বভোগীদের অতিরিক্ত মুনাফা এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজিও মূল্যবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করে। অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদক বা আমদানিকারকের পর্যায় থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত পণ্য পৌঁছাতে একাধিক হাতবদল হয়। ফলে প্রতিটি পর্যায়ে মুনাফা যুক্ত হয়ে ভোক্তাকে চড়া দাম দিতে হয়।
বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ থাকলেও তার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। নিয়মিত বাজার তদারকি, জরিমানা কিংবা ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে বাজার স্থিতিশীল রাখতে হলে প্রয়োজন সমন্বিত ও ধারাবাহিক পদক্ষেপ। শুধু খুচরা বিক্রেতাদের ওপর অভিযান পরিচালনা করে বাজারের অস্থিরতার মূল কারণ দূর করা সম্ভব নয়। উৎপাদক, আমদানিকারক, পাইকারি ব্যবসায়ী ও খুচরা বিক্রেতা—সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিটি পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
প্রথমত, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উৎপাদন, আমদানি, মজুত ও সরবরাহের নির্ভরযোগ্য তথ্যভান্ডার গড়ে তোলা জরুরি। কোন পণ্যের চাহিদা কত, উৎপাদন কত হচ্ছে, কী পরিমাণ আমদানি প্রয়োজন এবং কোথায় সরবরাহ ঘাটতি রয়েছে—এসব তথ্যের ভিত্তিতে আগাম পরিকল্পনা নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যেন কৃত্রিম সংকট তৈরি করে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, সে জন্য প্রতিযোগিতা আইন ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যে সরাসরি সংযোগ বাড়াতে হবে। কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি মধ্যস্বত্বভোগীদের অযৌক্তিক মুনাফার সুযোগ কমাতে হবে। কৃষিপণ্য সংরক্ষণে আধুনিক গুদাম, হিমাগার ও পরিবহন অবকাঠামো উন্নয়ন করা গেলে মৌসুমি সরবরাহের ঘাটতি এবং পচনজনিত ক্ষতি কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে কৃষকদের জন্য সাশ্রয়ী কৃষি উপকরণ, সহজ ঋণ ও বাজারসংক্রান্ত তথ্য নিশ্চিত করা জরুরি।
চতুর্থত, আমদানিনির্ভর পণ্যের ক্ষেত্রে শুল্ক, কর ও আমদানি নীতিতে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কোনো পণ্যের সরবরাহ সংকট দেখা দিলে দ্রুত আমদানির ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে শুল্ক ছাড় দেওয়া যেতে পারে। তবে এসব সুবিধা যেন ভোক্তার কাছে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করতে আমদানি থেকে খুচরা বিক্রি পর্যন্ত মূল্য পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যতালিকা প্রদর্শন, নিয়মিত বাজার প্রতিবেদন প্রকাশ এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। পাশাপাশি নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রির কার্যক্রম আরও বিস্তৃত ও লক্ষ্যভিত্তিক করা যেতে পারে।
নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখা কেবল অর্থনৈতিক বিষয় নয়; এটি সামাজিক ন্যায়বিচার ও জনজীবনের স্বস্তির সঙ্গেও সম্পর্কিত। বাজারের অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণে বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, প্রয়োজন উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পুরো সরবরাহ ব্যবস্থার সংস্কার। সরকারের নীতিগত দৃঢ়তা, ব্যবসায়ীদের দায়িত্বশীলতা এবং কার্যকর বাজার তদারকির সমন্বয় ঘটলেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা সম্ভব হবে। বাজারে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে হলে কথার চেয়ে কার্যকর পদক্ষেপই এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
আলীমুল ইসলাম, শিক্ষক, গ্রীনওয়ার্ল্ড স্কুল, ঢাকা।
(‘খোলা কলম’ বিভাগে প্রকাশিত লেখাগুলো সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখকের নিজস্ব মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। এসব লেখার বিষয়বস্তু, বক্তব্য ও মতামতের দায়ভার সম্পূর্ণ লেখকের।)
Posted ৬:১৮ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬
9 News Bd | s s